img

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় চার কোটি মানুষের বসবাস। প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশনসহ নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে রয়েছেন তারা। এসব সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, রাজনৈতিক দলের নীতি পরবর্তীতে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়িত হয়। তাই আসন্ন নির্বাচনের ইশতেহারে দলগুলোকে উপকূলীয় সমস্যা ও তা সমাধানের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

রোববার (১১ জানুয়ারি) রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপকূলের মানুষের সংকট নিরসনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নির্বাচনি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। লোকাল এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ সোসাইটি (লিডার্স) এবং মিডিয়া স্ট্রিম যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।

সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। 

এ সময় ঢাকা স্ট্রিমের অপ-এড এডিটর জাভেদ হুসেনের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্যে লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, উপকূলের চার কোটি মানুষের সংকট নিয়ে এনজিওগুলো কাজ করছে। কিন্তু মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এসব সমস্যা সমাধানে আমাদের সবার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। 

সংলাপে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লিডার্সের ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামস এ বি এম জাকারিয়া। প্রবন্ধে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলের মানুষ শহরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং নারীর প্রজনন ক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এ সময় তিনি ২১ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবির মধ্যে রয়েছে—উপকূল উন্নয়ন বোর্ড গঠন, পরিবেশবান্ধব ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা, উপকূলীয় অঞ্চলকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা, বিশেষ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে টেকসই ড্রেনেজ পরিকল্পনা এবং ভরাট হওয়া নদী ও খালে ড্রেজিং, নারী ও শিশুবান্ধব করে সাইক্লোন শেল্টার সংস্কার, স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও ভঙ্গুর স্লুইচগেট মেরামত এবং উপকূলীয় মানুষের নিরাপদ খাবার পানির টেকসই ও স্থায়ী সমাধান করা।

সংলাপে অংশ নিয়ে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পরিচালক পার্থ হাফেজ শেখ বলেন, জলবায়ু খাতে বরাদ্দ আছে, কিন্তু তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিতের বিষয়টি দলগুলোর ইশতেহারে থাকা দরকার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক আমিনুর রসুল বাপা বলেন, উপকূলীয় এলাকায় যারা সংসদ নির্বাচন করবেন, তাদের কাছে দাবিগুলো তুলে ধরতে হবে। তারা যখন জনগণের কাছে যাবেন তখন যেন জবাবদিহিটা হয়। 

আন্তর্জাতিক শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশের নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, এক মাস দূরে নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে সরকার শুধু নয়, আমরা ভবিষ্যৎ নির্বাচন করব। অনেক রকম উন্নয়নের কথা হচ্ছে, কিন্তু ইমিনেন্ট জাতীয় সংকট ক্লাইমেট চেঞ্জ সেভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে না। এ জন্য দুটো জিনিস দরকার—পলিটিকাল উইল ও ন্যাশনাল অ্যাওয়ারনেস।

জলবায়ু অধিপরামর্শ ফোরামের সদস্যসচিব মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে পলিটিক্যাল পার্টির কমিটমেন্ট দরকার। অতীতে যে পদ্ধতিতে নদী শাসন হয়েছে, এটি আত্মহত্যার মতো। এখান থেকে বেরিয়ে এসে নদী বাঁচাতে হবে।

হেলভেটাস-এর হেড অব প্রোগ্রামস মাহমুদুল হাসান বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশে ১০ হাজার কোটি টাকা ওয়াশ বাজেট রয়েছে। যথেষ্ট বাজেট আছে, কিন্তু এই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে সে প্রশ্ন করার সময় এসেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) রিসার্চ, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড ক্যাম্পেইন কো-অর্ডিনেটর রেহনুমা নওরীন বলেন, আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন আছে। কিন্তু সেখানে নারী ও শিশুর তেমন উল্লেখ নেই। আমরা মুখে অনেক কথা বলি, কিন্তু কাজ তেমন খুঁজে পাই না।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিত সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক সংস্থা হেক্স/এপার-এর উপদেষ্টা শেখর চক্রবর্তী বলেন, পলিটিকাল পার্টির কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার) ছাড়া ক্লাইমেট বাজেটের একাউন্টিবিলিটি নিশ্চিত হবে না। নদী দখল করলে ঠিক কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, ইশতেহারে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট বিষয় চাই।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান বলেন, জলবায়ু ফান্ড যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলের কাছে দাবি থাকবে, বরাদ্দটা যথাযথভাবে যেন ব্যবহার করা হয়।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, উপকূল বাংলাদেশের জন্য আশির্বাদ। এটি আশির্বাদ হবে নাকি অভিশাপ হবে, সেটি রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করে; যেহেতু পলিসি ঠিক করে তারা।

ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ বলেন, এ আলোচনাকে আমরা শুরু বলছি। সবার অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা থাকলে আমরা এটি চালু রাখতে চাই। কোন দল ক্ষমতায় গেল এটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। জনগণের চিন্তার পক্ষে সম্মতি উৎপাদন গণমাধ্যমের কাজ। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সে কাজটি করব।   

এ সময় আরও বক্তব্য দেন ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল, বাসদ মার্কসবাদীর সদস্য সদস্য সীমা দত্ত, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরিন সুলতানা মিলি, গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য মনির উদ্দিন পাপ্পু, এনসিপির ঢাকা মহানগরের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াহেদ আলম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য রাগিব আহসান এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক নাহিদুল খান।

এই বিভাগের আরও খবর